যায় না দেখা এ দৃশ্য

প্রকাশিত: 07/08/2020

মিজানুর রহমান মিজান

যায় না দেখা এ দৃশ্য

 সত্তর দশকের প্রথমার্ধে আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন সুপ্রিয় শিক্ষক প্রয়াত আলতাফুর রহমান ছাদ মিয়া ক্লাসে অনেক সময় গল্পচ্ছলে বলতেন টেলিভিশনের কথা। বলতেন তোমরা রেডিওর সাথে পরিচিত আছ। কিন্তু টেলিভিশন এখন ও দেখনি। টেলিভিশনে খবর পাঠকের ছবিও দেখা যায়। আমরা তন্ময় হয়ে শুনতাম তিনির কথা। স্যার চলে যাবার পর ক্লাসমিটরা একত্রিত হয়ে বলাবলি করতাম এ কি করে সম্ভব খবর পাঠকের ছবি দেখা যায়?ছোট বাক্সের মধ্যে কি ভাবে এত বড় আকৃতির মানুষ ঢুকে থাকবে বা কেমন করে ঢুকবেন। আবার স্যার আমাদেরকে সতর্ক করে দিতেন গ্রামে গিয়ে মানুষের সাথে এ কথা বল না। তাহলে গ্রামের মানুষ তোমাদেরকে নিয়ে হাসাহাসি করবে অসম্ভব বিষয় বিবেচনায়।অপেক্ষা কর অচিরেই তা প্রত্যক্ষ করতে পারবে। তখন মানুষ ও তা বিশ্বাস করবে। 
   ১৯৭৮ সালে আমি যখন মদন মোহন কলেজের ছাত্র। তখন সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে অধিষ্টিত সময়ের আলোচিত ব্যক্তি জনাব বাবরুল হোসেন বাবুল। একদিন শ্রুত হলাম সকাল বারো ঘটিকায় টেলিভিশনে প্রদর্শিত হবে মোহাম্মদ আলী ক্লে’র মুষ্টিযুদ্ধ। কথাটি শুনে এমন আগ্রহ সৃষ্টি হল, একই সাথে দু’টি বিষয়ের সহিত পরিচিতি লাভের আকাঙ্ক্ষায় আকর্ষিত হয়ে সে দিন আর কলেজ অভিমুখে যাত্রার কথা সম্পূর্ণ ভুলেই গেলাম।একটি হচেছ প্রথম টেলিভিশন দর্শন ও অপরটি হচেছ মোহাম্মদ আলী ক্লে’র মুষ্টিযুদ্ধ দর্শন ও মুষ্টিযুদ্ধের সহিত পরিচিত হওয়া। প্রতিক্ষিত সময়ে পৌরসভার একটি কক্ষে  টেলিভিশন ছেড়ে প্রদর্শনী হয় শুরু। কক্ষে তিল ধারণের ঠাই নেই। সকল মানুষ দাড়িয়ে তা অবলোকন করতে লাগলাম। সে কি মহা আনন্দ।স্মৃতির পাতা হাতড়িয়ে আজো তা স্মরণে মনে জাগে আলোড়ন।টেলিভিশন দেখেছি, দেখেছি মুষ্টিযুদ্ধ খেলা। বিজয়ের যে কি আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। তা শুধু অনুভব, অনুভুতির বিষয়।যেন রাজ্য জয়ের বীর সেনানী।পাঠক সঠিক সময় এখন স্মরণ নেই বহু দিন আগের কথা তো। তাই এ ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থী।সম্ভবত দ্বিতীয়বার টেলিভিশন দেখি ১৯৮০ সালে সিলেট পৌরসভা প্রাঙ্গনেই।সেদিন কিন্তু দেখেছিলাম রাতের বেলা।আমি তখন দিনের বেলা করতাম সাবরেজিষ্টারী অফিসে চাকুরী। সন্ধ্যার পরই চলে যেতাম মদন মোহন কলেজে নাইট সেকশনে ক্লাস করতে। এ দিন ছিল কলেজ বন্ধ। তাই সন্ধ্যার পরই বের হয়েছিলাম সিলেট শহর ঘুরে দেখতে। সময় রাত অনুমানিক সাত বা সাড়ে সাত ঘটিকা। আজকের বা সদ্য স্থাপিত কামরান চত্বর এলাকা লোকে লোকারন্য। পৌরসভার সম্মুখে কাঠের তৈরী বড় আকারের একটি স্টান্ডের উপর টেলিভিশন রেখে হচিছল প্রদর্শিত।অনেক রিকশাওয়ালা রিক্সা দাড় করিয়ে বসে দেখছিলেন। সবাই কিন্তু দাড়ানো আর সম্মুখ ভাগে থাকা লোক ছিলেন বসা। 
   আমরা গ্রামের মানুষ। শহরে যেতাম কার্যপোলক্ষ্যে। কাজ শেষে চলে আসতাম গ্রাম অভিমুখে।রাত হোক আর দিনই হোক।আজও চলছে আমাদের জীবন যাত্রা। হতে পারিনি শহরের বাসিন্দা। তাই বলে ভাববেন না কেহ শহর বা শহরের মানুষের প্রতি হিংসুটে।মোটেই না।শহর আছে বলেই আমি গ্রাম্য জীবনের অধিকারী। আবার গ্রাম থেকে শহরে গেলে পাই নতুনত্ব ইট বালির সংযোজনে সংযোজিত প্রাসাদ, শহুরে মানুষের সান্নিধ্য, পরিচয়, পরিবেশ আর আধুনিকতার ছাপের সুস্পষ্টতার ব্যবধান ।তা আলাদা অনুভুতি।পৃথিবী পরিবর্তনশীল। নতুনত্বের প্রকটতা। সেদিনের সিলেট শহর আর আজকের সিলেট শহর রাত দিনের পার্থক্য বা পরিবর্তন।সেই ১৯৭৭ সালে যখন কলেজে যেতাম বেলবটম পেন্ট পরে।হাইহিল জুতো পরে।জুতো কিন্তু নিতে হত হাতে করে।সুবিধাজনক স্থানে গিয়ে পরে নিতাম জুতো।হাই স্কুল জীবন চলেছে আমাদের জুতো বা সেন্ডেলবিহীন লুঙ্গি পরে।শহরে যেত েযখন অভ্রস্ত হলাম , তখন হলাম পেন্ট পরার অধিকারী। বাড়ি থেকে বের হতাম সাত সকালে। গ্রামের কাদাযুক্ত রাস্তাঘাট মাড়িয়ে শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে। গ্রামের মাঠে যারা থাকতেন কাজকর্মে নিয়োজিত। অনেক সময় আমাদেরকে পেন্ট পরিহিত দেখলে তারা করতেন হাসি, তামাশা।বলতেন উচ্চস্বরে “চোঙ্গা, চোঙ্গা” বলে।কত পরিবর্তন।আমরা পেন্ট পরে চলতে অনেক সময় হতাম বিব্রত গ্রাম্য পরিবেশে। আজ গ্রামের মাঠে সকলেই কাজ করেন পেন্ট পরে।কত স্বাচ্ছন্দ্যবোধ আর মন ও মননের পরিবর্তনশীলতা।যাহোক এবার চলে আসছি মুল প্রসঙ্গে। আমাদের কথা শুরু হয়েছিল টেলিভিশন নিয়ে। 
    ধীরে ধীরে শুরু হল টেলিভিশনের অগ্রযাত্রা, সহজলভ্যতা ও প্রচলনের আধিক্যতা।আমার গ্রামে প্রথম টেলিভিশন আনেন ১৯৮৩ সালে একজন মুরব্বি আবুল হোসেন নামীয়। যিনি বর্তমানে এ জগতে নেই। হয়েছেন প্রয়াত প্রায় বিশ বৎসর পূর্বে। আর তা প্রদর্শন বা দেখার কি যে আনন্দ?টেলিভিশন ছিল কত সমাদৃত।যা আজ হয়েছে অনেকটা পানসে।সন্ধ্যা হলেই তিনির বাড়িতে ভীড় জমাতেন আবালবৃদ্ধভনিতা।সংগৃহিত ছবির মতো বসে দেখতেন উৎসুক জনতা। বিনোদনের গ্রামের মানুষের ছিল মনে মহোৎসবসম বা আনন্দের হাতিয়ার। নারীরা দেখতেন আড়ালে আবড়ালে থেকে সতর্কতা নিয়ে।চলত গল্প গোজব নানাবিধ বিষয়ে টেলিভিশন দেখার পাশাপাশি।অনেক দিন ছিল তা প্রচলিত। তারপর দিনে দিনে অগ্রযাত্রা সমাজ সামাজিকতার। আজ গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে টেলিভিশনের ছড়াছড়ি। রোমে রোমে টেলিভিশন থাকার কথা বললে মনে হয় অত্যুক্তি হবে না।মনে পড়ে সময়ের কথা, প্রবাদ বাক্যের কথা। “সময়ের এক ফোঁড, অসময়ের দশ ফোঁড” প্রবাদ বাক্যটির ব্যবহারের কথা। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার কথা।সম্মুখ পানে কি রয়েছে দেখার তা সময়ই বলে দেবে। র’লাম আশার আশে দেখার, প্রত্যক্ষ করার প্রত্যাশিত প্রত্যয়ের।
লেখক মিজানুর রহমান মিজান, সম্পাদক দীপ্তি, গ্রাম জয়নগর, বিশ্বনাথ, সিলেট।

আরও পড়ুন

×